কোরআনের আলোকে মহান আল্লাহর আরশে সমাসীন হওয়া (১)
কোরআনের আলোকে মহান আল্লাহর আরশে সমাসীন হওয়া (১)

কোরআনের আলোকে মহান আল্লাহর আরশে সমাসীন হওয়া (১)

এ. কে. এম. আনোয়ারুল কবীর  কোরআনের আলোকে মহান আল্লাহর আরশে সমাসীন হওয়া (১)

সারাংশ: যখন কোন বক্তা আসন গ্রহণ ও উপবেশনের অর্থ বোঝাতে চান তখন আরবিতে سرير أَرائِكِ শব্দ দু’টি ব্যবহার করেন। কিন্তু যখন পরিচালনার দায়িত্ব পালনের জন্য যে আসনে বসা হয় অর্থাৎ যে ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির নিদর্শন তা বোঝানো হয়, তখন আরশ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। এ বিষয়টি হযরত ইউসুফ (আ.) ও রাণী বিলকিস সম্পর্কিত আয়াত দু’টি থেকে স্পষ্ট হয়।

ট্যাগ: কোরআন, মহান আল্লাহর আরশ, সমাসীন হওয়া, জগত পরিচালনা ব্যবস্থা, ثُمَّ ٱسْتَوَىٰ عَلَى ٱلْعَرْشِ يُدَبِّرُ ٱلأَمْرَ

প্রবন্ধ১: ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই পবিত্র কোরআনের ‘পরম করুণাময় আরশের ওপর সমাসীন’  আয়াতসহ যে সকল আয়াতে মহান আল্লাহর আরশে সমাসীন হওয়ার বিষয়টি উল্লিখিত হয়েছে তা নিয়ে বিভিন্নরূপ ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ উপস্থাপিত হয়েছে। মহান আল্লাহর দৈহিক সত্তায় বিশ্বাসী গোষ্ঠী (مُجَسَّمِه) এ ধরনের আয়াতগুলোতে ব্যবহৃত ‘استوی’ শব্দটিকে ‘আসন গ্রহণ অর্থে’ প্রয়োগ করেছে।  এমনকি কেউ কেউ সূরা বনি ইসরাঈলের ৭৯ নং আয়াতে বর্ণিত মহানবী (সা.)-কে দেয়া প্রতিশ্রুত ‘প্রশংসিতের মর্যাদা’ বলতে কিয়ামতের দিন আরশে মহান আল্লাহর পাশে আসন গ্রহণ অর্থ করেছেন।  কিন্তু যারা মহান আল্লাহর বস্তু সত্তার ঊর্ধ্বে হওয়ার ধারণায় বিশ্বাসী- আহলে সুন্নাতের সবচেয়ে বড় দল আশয়ারী এবং ক্ষুদ্র অন্যান্য দল, যেমন মুতাজিলা, মাতিরিদী এবং মহানবী (সা.)-এর আহলে বাইতের অনুসারীদের সকল দল মহান আল্লাহর আরশে সমাসীন হওয়া সম্পর্কিত আয়াতগুলোকে রূপক অর্থে গ্রহণ করেছে এবং ‘কোন কিছুই মহান আল্লাহর সদৃশ নয়’ আয়াতটিসহ পবিত্র কোরআনের অন্যান্য আয়াতের সাহায্য নিয়ে উল্লিখিত আয়াতকে ভিন্ন অর্থে ব্যাখ্যা করেছে। তারা বলে, আরশে সমাসীন হওয়ার অর্থ বিশ্ব ও সৃষ্টি জগতকে পরিচালনা করা। এ অর্থটি অনুধাবনের জন্য পাঁচটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। যথা :

১.     পবিত্র কোরআনে ব্যবহৃত استواء শব্দটির (যা استوی ক্রিয়ামূল থেকে উদ্ভূত) কোরআনগত ও আভিধানিক অর্থ ও ব্যবহার।

২.     ‘আরশ’ (عرش) শব্দটি কোরআনে কী কী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে?

৩.     পবিত্র কোরআনে ‘মহান আল্লাহ আরশে সমাসীন হলেন’ আয়াতটির পূর্বে ও পরে যে বাক্যগুলো ব্যবহৃত হয়েছে তার ভাবার্থ ও তাৎপর্য কী?

৪.     ভিন্ন অর্থবাহী ইঙ্গিতমূলক বাক্যে বাহ্যিক ও প্রত্যক্ষ অর্থ মূল উদ্দেশ্য নয়; বরং পরোক্ষ ও আবশ্যক অর্থই মুখ্য।

৫.     ‘মহান আল্লাহ কোন কিছুর সদৃশ নন’- আয়াতটির অর্থ।

আমরা যখন এই পাঁচটি বিষয়কে ব্যাখ্যা করব তখন আলোচ্য আয়াতের প্রকৃত অর্থ আমাদের সামনে স্পষ্ট হবে। ‘استوی’ এর আভিধানিক অর্থ সম্পর্কে ইবনে মানযুর বলেছেন : استوی  শব্দটি নিম্নোক্ত তিনটি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যথা :

১.     পূর্ণতায় পৌঁছা ও বিকশিত হওয়া;

২.     জয় ও আধিপত্য লাভ;

৩.     ভারসাম্য অর্জন, স্থিতি লাভ।

এ তিনটি অর্থ থেকে বোঝা যায় استوی শব্দটি কখনই جلس বা قعد অর্থাৎ বসল বা আসন গ্রহণ করল অর্থে ব্যবহৃত হয় না। তাই আরবি ভাষায় কাউকে বসতে নির্দেশ দান করতে اِسو শব্দটি ব্যবহার হতে দেখা যায় নি; বরং এ ভাষায় শব্দটি সাধারণত সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ হওয়া অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। সুতরাং এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, استوی শব্দটি কখনও সামঞ্জস্যপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা বোঝাতে, কখনও বিকাশ ও পূর্ণতা লাভ, আবার কখনও প্রতিষ্ঠিত ও আধিপত্য লাভ অর্থে প্রয়োগ হয়ে থাকে।

আখফাশ বলেছেন : استوی অর্থ নিয়ন্ত্রণ লাভ ও প্রতিষ্ঠিত হওয়া। আরবরা যখন বলে : استويت فوق الدابه- তার অর্থ হলো পশুর ওপর স্থিত হয়েছি ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছি। যদিও এ ক্ষেত্রে পশুর ওপর নিয়ন্ত্রণ লাভ ও স্থিতি অর্জনের সঙ্গে আরোহণের অপরিহার্য সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তুاستوی  ও আরোহণ সমার্থক নয়। কারণ, প্রকৃত উদ্দেশ্য পশুর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভ।

পবিত্র কোরআনে استوی এর ব্যবহার

এখন আমরা দেখব পবিত্র কোরআনে استوی শব্দটি কী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। استوی শব্দটি কোরআনে সতের বার এসেছে। তন্মধ্যে সাতবার আল্লাহর আরশের ওপর সমাসীন হওয়া বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। এ বাক্যগুলোতে استوی শব্দটি علی (ওপর) অব্যয়ের সাথে উল্লিখিত হয়েছে। কিছু আয়াতে استوی শব্দটি الی অব্যয়ের সাথে এবং কিছু আয়াতে কোন অব্যয়ের সঙ্গ ছাড়াই এসেছে। আমরা এ সম্পর্কিত কিছু আয়াত নমুনাস¦রূপ নি¤œ উল্লেখ করছি :

১. কোরআনে হযরত মূসা (আ.) সম্পর্কে বলা হয়েছে :

وَلَمَّا بَلَغَ اَشُدَّهُ وَاسْتَوَىٰ آتَيْنَاهُ حُكْمًا وَعِلْمًا 

যখন সে (মূসা) পূর্ণ যৌবনে উপনীত এবং (মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে) দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত হলো তখন আমরা তাকে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করলাম।’ (সূরা কাছাছ : ১৪)

২. সূরা ফাত্হ-এর ২৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে :

كَزَرْعٍ اَخْرَجَ شَطْاَهُ فَآزَرَهُ فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوَىٰ عَلَىٰ سُوقِهِ

...একটি শস্য ক্ষেতের ন্যায় যা অঙ্কুর নির্গত করে। অতঃপর তা শক্ত ও পুষ্ট হয়। অতঃপর স্বীয় কা-ের ওপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায়...

আয়াতটিতে استوی শব্দটির মাধ্যমে গাছের দৈহিক পূর্ণতা ও বৃদ্ধি ঘটে নিজের মূলের ওপর দাঁড়ানো ও দৃঢ়তা লাভ বুঝানো হয়েছে।

৩. নৌযান ও চতুষ্পদ জন্তুর ক্ষেত্রে استوی শব্দটি ব্যবহার করে কোরআন বলেছে : 

وَالَّذِي خَلَقَ الْاَزْوَاجَ كُلَّهَا وَجَعَلَ لَكُم مِّنَ الْفُلْكِ وَالْاَنْعَامِ مَا تَرْكَبُونَ ﴿١٢﴾ لِتَسْتَوُوا عَلَىٰ ظُهُورِهِ ثُمَّ تَذْكُرُوا نِعْمَةَ رَبِّكُمْ اِذَا اسْتَوَيْتُمْ عَلَيْهِ وَتَقُولُوا سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَـٰذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ 

আর তিনি তোমাদের জন্য নৌযান ও গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন যার ওপর তোমরা আরোহণ করে থাক, (তাদের এরূপ করেেছন) যেন তোমরা সেগুলোর পিঠে স্থিরভাবে বসতে পার। অতঃপর যখন তাদের ওপর স্থিত হও তখন তোমাদের প্রতিপালকের নেয়ামতকে স্মরণ কর।’ (সূরা যুখরুফ : ১২-১৩)

এ আয়াতটিতে প্রথমে জাহাজ, নৌকা এবং চতুষ্পদ জন্তুর ওপর আরোহণের কথা বর্ণিত হয়েছে যেখানে رکب শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। অতঃপর استوی শব্দটি এসেছে। এ থেকে বোঝা যায়, নৌযান ও চতুষ্পদ জন্তুর ওপর আরোহণ এবং استوی দুটি ভিন্ন জিনিস। প্রথমে আরোহণ কর্ম সংঘটিত হয়, তারপর استوی এর বিষয়টি ঘটে।

এ পরম্পরা থেকে আমরা এ বিষয়টি বুঝতে পারি যে, استوی হলো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও স্থিতি লাভ যা বাহনকে উদ্ধত অবস্থা ও নিয়ন্ত্রণহীনতা থেকে বশ্যতার অবস্থায় নিয়ে আসার প্রতি ইঙ্গিত করে। অন্যভাবে বলা যায়, যদিও এ ক্ষেত্রে استوی বা স্থিতি অবস্থায় আনয়নের সঙ্গে বসা ও আরোহণের সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু استوی শব্দটি স্বয়ং উপবেশন শব্দের অর্থ বহন করে না; বরং বাহনকে নিয়ন্ত্রণ ও পশুকে আরোহণের জন্য বশ করার সঙ্গে সম্পর্কিত। এক কথায় বলা যায়, استوی শব্দটি এ ক্ষেত্রে বাহনকে নিজের পূর্ণ অধীনে আনা ও তার ওপর নিয়ন্ত্রণ লাভ অর্থের সাথে অধিক সঙ্গতিশীল। পবিত্র কোরআনের অন্য আয়াতে নূহ (আ.)-এর মহা প্লাবনের ঘটনায় বলা হয়েছে :

وَقِيلَ يٰأَرْضُ ٱبْلَعِى مَآءَكِ وَيٰسَمَآءُ أَقْلِعِى وَغِيضَ ٱلْمَآءُ وَقُضِىَ ٱلأَمْرُ وَٱسْتَوَتْ عَلَى ٱلْجُودِىِّ وَقِيلَ بُعْداً لِّلْقَوْمِ ٱلظَّالِمِينَ

এবং পানি শুকিয়ে দেয়া হলো। কাজের সমাধা করা হলো এবং নৌকা জুদী পাহাড়ে স্থিত হলো।’ (সূরা হুদ : ৪৪)

এ আয়াতে নিঃসন্দেহে استوی শব্দ দ্বারা নৌকা পাহাড়ে বসা ও আসন গ্রহণ বোঝানো হয়নি; বরং যেহেতু নৌকা প্লাবনের পানিতে দুলছিল, সেহেতু যখন জুদী পর্বতের চূড়ায় ভিড়ল ও নোঙ্গর ফেলল তখন দোলন অবস্থা থেকে স্থিতি লাভ করল। আভিধানিকদের বক্তব্য এবং উল্লিখিত আয়াতগুলোর আলোকে বলা যায়, আরবি ভাষায় কখনও استوی শব্দটি قعد (বসা) جلس (আসন গ্রহণ) বা رکب (আরোহণ)-এর সমার্থক নয় এবং কখনও এ তিনটি শব্দের স্থলাভিষিক্ত হয় না। তবে এ সম্ভাবনা রয়েছে যে, কোন কোন ক্ষেত্রে استوی কর্মটি বাস্তব রূপ লাভের জন্য আসন গ্রহণ, বসা ও আরোহণের প্রয়োজন। কিন্তু এ শব্দটির প্রকৃত অর্থ পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ, আধিপত্য লাভ এবং স্থিতি প্রতিষ্ঠা।

পবিত্র কোরআনে ‘আরশ’ শব্দের ব্যবহার

কোরআনে তিনটি কাছাকাছি অর্থের শব্দ বিভিন্ন স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে। যথা :

১.     سرير : علی سرر متقالين (বেহেশতবাসীরা) সামনাসামনি আসনে বসে থাকবে। 

২.     مُتَّكِئينَ فيها عَلَى الْأَرائِكِ لا يَرَوْنَ فيها شَمْساً وَ لا زَمْهَريرا: أَرائِكِ অর্থাৎ তারা সেখানে পালঙ্কের ওপর হেলান দিয়ে বসবে, সেখানে তারা না প্রখর রোদ অনুভব করবে আর না প্রচ- শীত।

এ দু’টি আয়াতে দেখা যায় سرير أَرائِكِ শব্দ দু’টি মানুষের বসার জন্য প্রস্তুত আসনের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে এবং এই দুটি শব্দ প্রতাপ, প্রতিপত্তি ও আধিপত্যের কোন চিহ্ন বহন করে না। কোরআনে যেখানেই এমন আসনের কথা বলা হয়েছে- যার ওপর মানুষ বিশ্রাম অথবা আরাম-আয়েশের জন্য বসে, সেখানে উল্লিখিত দু’টি শব্দের যে কোন একটি ব্যবহৃত হয়েছে।

৩.     عرش শব্দটি যে কোন আসনের জন্য পবিত্র কোরআনে ব্যবহৃত হয়নি; বরং এমন আসনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে যার ওপর বসা ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও আধিপত্যের নিদর্শন। এরূপ কিছু আয়াত এখানে আমরা উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করছি। কোরআন ইউসুফ (আ.)-এর পিতা-মাতার মিশরে আগমনের ঘটনায় যখন তাঁরা তাঁর প্রাসাদে প্রবেশ করেন এবং তিনি তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন, তা এভাবে বর্ণনা করেছে :

فَلَمَّا دَخَلُواْ عَلَىٰ يُوسُفَ آوَىٰ إِلَيْهِ أَبَوَيْهِ وَقَالَ ٱدْخُلُواْ مِصْرَ إِن شَآءَ ٱللَّهُ آمِنِينَ وَرَفَعَ أَبَوَيْهِ عَلَى ٱلْعَرْشِ

যখন তারা ইউসুফের নিকট আসল, সে তার পিতা-মাতাকে তার কাছে সম্মানজনক স্থান দিল এবং বলল : আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী তোমরা শান্তিতে মিশরে প্রবেশ কর। এবং সে তার পিতা-মাতাকে সিংহাসনের ওপর বসাল।’ (সূরা ইউসুফ : ১০০)

নিঃসন্দেহে এ আয়াতে ‘আরশ’ বলতে হযরত ইউসুফ (আ.) সাধারণত যেখানে বসতেন সে আসন অথবা যে বিছানায় ঘুমাতেন তার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়নি। বরং নির্দিষ্ট একটি আসন যাতে বসে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন এবং তাঁর ক্ষমতার নিদর্শন বলে গণ্য হতো তা বোঝানো হয়েছে।

সাবার রাণী বিলকিসের রাজত্বের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলা হয়েছে :

اِنِّي وَجَدتُّ امْرَاَةً تَمْلِكُهُمْ وَاُوتِيَتْ مِن كُلِّ شَيْءٍ وَلَهَا عَرْشٌ عَظِيمٌ

নিশ্চয় আমি এক নারীকে দেখেছি যে তাদের (নাগরিকদের) ওপর রাজত্ব করছে। তাকে সবকিছু দেয়া হয়েছে এবং তার একটি বড় সিংহাসন আছে।’ (সূরা নাম্ল : ২৩)

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে :

قَالَ يَا اَيُّهَا الْمَلَاُ اَيُّكُمْ يَاْتِينِي بِعَرْشِهَا قَبْلَ اَن يَاْتُونِي مُسْلِمِينَ

[হযরত সুলাইমান (সভাসদদের উদ্দেশে)] বলল, তোমাদের মধ্যে কে তার আত্মসমর্পিত হয়ে আমার নিকট আগমনের পূর্বেই তার সিংহাসন আমার সামনে নিয়ে আসবে?’ (সূরা নাম্ল : ৩৮)

মহান আল্লাহর সঙ্গে কোন উপাস্যের বিদ্যমানতাকে অসম্ভব বলে উল্লেখ করে বলা হয়েছে :

قُلْ لَّوْ كَانَ مَعَهُ آلِهَةٌ كَمَا يَقُولُونَ إِذاً لاَّبْتَغَوْاْ إِلَىٰ ذِى ٱلْعَرْشِ سَبِيلاً

"তুমি বল: ‘যদি তাঁর সাথে, যেমন তারা বলে, আরও উপাস্য থাকত সেক্ষেত্রে অবশ্যই তারা আরশের অধিপতির নিকট পৌঁছবার পথ খুঁজত’” (বনি ইসরাঈল: ৪২)

এ আয়াতটিতে যে বলা হয়েছে, ‘আরশের অধিপতির নিকট পৌঁছবার পথ খুঁজত’, এর অর্থ তাঁর আরশ দখলের জন্য চেষ্টা চালাত। নিঃসন্দেহে আরশ দখলের অর্থ এটা নয় যে, বিশেষ কোন আসন অধিকারের জন্য তারা প্রচেষ্টা চালাবে; বরং উদ্দেশ্য হলো বিশ্বজগতের কর্তৃত্ব হস্তগত করার জন্য তাঁর সঙ্গে  দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতো। সুতরাং আয়াতে ذِى ٱلْعَرْشِ বলতে সৃষ্টিজগতের পরিচালক বোঝানো হয়েছে।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, যখন কোন বক্তা আসন গ্রহণ ও উপবেশনের অর্থ বোঝাতে চান তখন আরবিতে سرير أَرائِكِ শব্দ দু’টি ব্যবহার করেন। কিন্তু যখন পরিচালনার দায়িত্ব পালনের জন্য যে আসনে বসা হয় অর্থাৎ যে ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির নিদর্শন তা বোঝানো হয়, তখন আরশ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। এ বিষয়টি হযরত ইউসুফ (আ.) ও রাণী বিলকিস সম্পর্কিত আয়াত দু’টি থেকে স্পষ্ট হয়। কারণ, যে আসনের উল্লেখ আয়াত দু’টিতে করা হয়েছে তা তাঁদের ক্ষমতার প্রতীক যাতে বসে তাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন। আর যে আয়াতটিতে আল্লাহকে ‘আরশের অধিপতি’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে তার অর্থও কখনও বসার আসন নয়; বরং এতে ‘আরশ’ শব্দটি রূপক অর্থে ক্ষমতার কেন্দ্র নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হয়েছে।

আরবি ভাষায়ও ‘আরশ’ শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন বলা হয়ে থাকে : الملک ثلَّ عرشُ , এর অর্থ রাজার সিংহাসনের পতন হয়েছে। অথবা ثلّ الله عرشهم অর্থ আল্লাহ তাদের রাজ্য ও ক্ষমতার পতন ঘটান।

সুতরাং ‘আরশ’ শব্দটি সার্বিকভাবে রাজা বা সম্রাটের বসার আসন নয়; বরং প্রকৃত অর্থে তা ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির নিদর্শন।

এ পর্যন্ত আলোচনা থেকে আমরা দু’টি সিদ্ধান্তে গ্রহণ করতে পারি।

প্রথমত, استوی শব্দটি আরবি ভাষার جلس বা আসন গ্রহণ শব্দের সমার্থক নয়। বরং তার থেকে ভিন্ন এক অর্থ যার সঙ্গে আধিপত্য, ক্ষমতা ও স্থায়িত্ব লাভের বিষয় সংযুক্ত। যেমন আরবি কবিতায় এসেছে :

قد استوی بشر علی العراق         من غير سيف و دم مهراق

অর্থাৎ (আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের ভাই) বাশার কোনরূপ রক্তপাত ছাড়াই ইরাকের ওপর আধিপত্য কায়েম করল (ও শাসনক্ষমতা হস্তগত করল)

দ্বিতীয়ত, ‘আরশ’ শব্দটি পবিত্র কোরআনে শাব্দিক অর্থে (অর্থাৎ ‘বসার বা আসন গ্রহণের স্থান’ অর্থে) ব্যবহৃত হয়নি; বরং যে আসনটি ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির নিদর্শন ও শক্তির প্রকাশক তাকে নির্দেশ করে। (চলবে)